পালানোর চেয়ে মৃত্যু ভালো

 

‘আমি এখানে জন্ম নিয়েছি। এখানেই মরব। পালিয়ে গিয়ে নিজেকে কলঙ্কিত করব না।’– গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত নিজ ভবনের ধসে পড়া ইটপাথরের মধ্যে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলছিলেন ২০ বছরের তরুণ মোহাম্মদ। তিনি বলেন, পালানোর চেয়ে মৃত্যু ভালো।

শুক্রবার, ইসরায়েল উত্তর গাজা উপত্যকা থেকে ২৪ ঘন্টার মধ্যে ১১ লাখ মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে একটি আল্টিমেটাম জারি করেছে। এরপর ঘটে এক নজিরবিহীন দৃশ্য। হাজার হাজার মানুষকে দল বেঁধে উত্তরাঞ্চল ছাড়তে দেখা যায়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, গাধা ও ঘোড়ায় টানা ভ্যান, মালবাহী ও ব্যক্তিগত গাড়িতে করে আসবাব নিয়ে শহর ছাড়ছে শত শত পরিবার। অনেকে হেঁটে রওনা হয়েছেন। মাইলের পর মাইল দীর্ঘ বাস্তুচ্যুত মানুষের সারি।

হাজার হাজার মানুষ ছুটছেন দক্ষিণের দিকে। তাদের হাতে এক দিনের সময়। সড়ক মাত্র একটি। হোয়াইট হাউস বলছে, অল্প সময়ে এত সংখ্যক মানুষকে সরে যেতে বলাটা ‘কঠিন নির্দেশনা’। গাজায় স্থল অভিযানের দিকে এগোচ্ছে ইসরায়েল। এ লক্ষ্যেই গাজা সিটির (উত্তরাঞ্চল) বাসিন্দাদের সরিয়ে দেওয়ার আলটিমেটাম দেওয়া হয়। এ অভিযানে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির আশঙ্কা করছে জাতিসংঘ। তারা বলছে, এত অল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক মানুষকে সরিয়ে নেওয়া ‘অসম্ভব’। বিশ্ব সংস্থাটি নির্দেশনা তুলে নিতে ইসরায়েলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। আগেই গাজা সীমান্তের কাছে লাখ লাখ সেনা, ট্যাঙ্ক ও নানা সামরিক সরঞ্জাম জড়ো করেছিল ইসরায়েল। রয়টার্স জানায়, শুক্রবার গাজা উপত্যকার কিছু অংশে প্রবেশ করেছে ইসরায়েলের ট্যাঙ্ক ও সাঁজোয়া যান। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনীর মুখপাত্র রিয়ার অ্যাডমিরাল দানিয়েল হ্যাগারি বলেন, ফিলিস্তিনের রকেট সৈনিকদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে ট্যাঙ্ক। পালানোর চেয়ে মৃত্যু ভালো

ইসরায়েলের অব্যাহত বিমান হামলায় গাজায় মৃত্যু বেড়ে ১ হাজার ৮৪৫ জনে পৌঁছেছে। হামাসের অভিযোগ, পলায়নরত বেসামরিক মানুষের ওপরও বোমা ফেলেছে ইসরায়েল। এতে অন্তত ৭০ জন নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী বলছে, আগামী দিনগুলোতে তারা গাজা সিটিতে বড় ধরনের অভিযান চালাবে। পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত বেসামরিক নাগরিকরা ফিরে আসতে পারবেন না। প্রতিরক্ষা বাহিনীর বিবৃতিতে গাজার বেসামরিক লোকজনের উদ্দেশে বলা হয়, আপনারা নিজেদের ও নিজ পরিবারের নিরাপত্তার জন্য দক্ষিণাঞ্চলে সরে যান। হামাসের যোদ্ধারা আপনাদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। তাদের থেকে নিজেদের দূরে রাখুন। বিবৃতিতে বলা হয়, হামাস যোদ্ধারা গাজা সিটির বাড়িঘরের নিচে সুড়ঙ্গপথ ও এমন সব ভবনে লুকিয়ে আছেন, যেখানে গাজার নিরীহ ও বেসামরিক মানুষ থাকেন। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনীর মুখপাত্র দানিয়েল হ্যাগারি বলেন, এত অল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক মানুষের পক্ষে সরে যাওয়াটা সম্ভব নয়, তা তারা বোঝেন। কিন্তু এ জন্য হামাস দায়ী। গাজার এ উত্তরাঞ্চল ‘ওয়াদি গাজা’ নামেও পরিচিত। অঞ্চলটি অপেক্ষাকৃত ঘনবসতিপূর্ণ। এখানেই গাজা সিটির অবস্থান। গত শনিবার নজিরবিহীন আকাশ, স্থল ও নৌ হামলায় ইসরায়েলে ১ হাজার ৩০০ মানুষ নিহত হয়। এর পর বিমান হামলা শুরু করে ইসরায়েল। সেই সঙ্গে অবরুদ্ধ উপত্যকায় বিদ্যুৎ, পানি ও খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। টানা সাত দিন ধরে জীবনধারণে অপরিহার্য নিত্যপণ্যের সরবরাহ বন্ধ থাকায় গাজায় চরম মানবিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে। সিএনএন জানায়, গাজায় মানবিক সংকট আরও প্রকট হচ্ছে। লোকজন অনাহারে থাকার ঝুঁকিতে আছেন। জাতিসংঘ বলছে, সার্বিক ব্যবস্থা ধসে পড়ার মুখে রয়েছে। নরওয়ের শরণার্থী কাউন্সিল সতর্ক করে বলেছে, অগণিত বেসামরিক মানুষকে দেওয়া সাধারণ সাজা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি। পালানোর চেয়ে মৃত্যু ভালো

শুক্রবার হামাস বলেছে, ইসরায়েলের বেপরোয়া বিমান হামলায় তাদের হাতে থাকা ১৩ জন ইসরায়েলি জিম্মি নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ছয়জন মারা গেছেন উত্তর গাজায়। সাতজন অন্যত্র মারা গেছেন। অন্তত দেড়শ ইসরায়েলিকে গাজায় ধরে নিয়ে গিয়েছিল হামাস। চলমান পরিস্থিতিতে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে অধিকৃত পশ্চিমতীরেও। ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে আলজাজিরা জানায়, সেখানে ইসরায়েলি সেনাদের হাতে এক সপ্তাহে অন্তত ৯ জন নিহত হয়েছেন। শুক্রবার জুমার নামাজের পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ করেন মুসল্লিরা। ইরাকের রাজধানী বাগদাদ ও ইরানের রাজধানী তেহরানে বিক্ষোভে লাখো মানুষের উপস্থিতি দেখা গেছে।

এদিকে জর্ডানের আম্মানে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেন। তিনি জর্ডানের বাদশাহ আব্দুল্লাহর সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন। এর আগে তিনি ইসরায়েলের প্রতি সংহতি জানাতে তেলআবিব সফর করেন। গাজার অভ্যন্তরে দীর্ঘ সুড়ঙ্গ ব্যবস্থা তৈরি করেছে হামাস। সেখানে প্রবেশ করে যুদ্ধ করাটা ইসরায়েলের জন্য চ্যালিঞ্জিং হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২১ সালে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী দাবি করেছিল যে, তারা হামাসের ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সুড়ঙ্গ নষ্ট করতে সক্ষম হয়েছে। এর জবাবে হামাস নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার জানান, গাজায় তাদের ৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সুড়ঙ্গ পথ রয়েছে। ইসরায়েল মাত্র ৫ শতাংশ ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। দ্বিতীয় বিবৃতিতে ভারসাম্য ভারতের ভারত এক বিবৃতিতে বলেছে, শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ভারত সব সময় দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনাকে সমর্থন করে। সেই সঙ্গে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও দৃশ্যমান ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে সমর্থন করে।

যুদ্ধ থামাতে চেষ্টা চালাচ্ছেন সালমান

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments