যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে বৈঠক হওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বৈঠকের ফলাফল নিয়ে প্রত্যাশা কমই রাখার চেষ্টা করেছিলেন। তবে তারপরো বুধবার ওই বৈঠকে দু’পক্ষের মধ্যে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সমঝোতা হয়।
প্রেসিডেন্ট বাইডেন বৈঠক শেষে বলেন, ‘এবারে আমাদের মধ্যে বেশ কিছু বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আমার ধারণা যেগুলো খুবই গঠনমূলক এবং ফলপ্রসূ ছিল।’
তিনি আরো বলেন, ‘কিছু ক্ষেত্রে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে।’
প্রেসিডেন্ট শি এর আগে স্বীকার করেন, ‘মার্কিন-চীন সম্পর্ক কখনোই মসৃণ ছিল না।’
তবে তিনি এটাও বলেন, ‘দুই পরাশক্তির একে অপরের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া কোনো অপশন হতে পারে না।’
ক্যালিফোর্নিয়ায় এই দ্বি-পক্ষীয় আলোচনা থেকে মূলত চারটি বিষয় জানা গেছে।
১। জলবায়ু ইস্যুতে ঐকমত্য
বিশ্বে সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণকারী এই দুই দেশ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় আরো পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। কিন্তু জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বন্ধ করার বিষয়ে তারা কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি।
তারা মিথেন নির্গমন কমিয়ে আনার ব্যাপারে একে অপরকে সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। মিথেন হলো এক ধরনের শক্তিশালী গ্রিনহাউজ গ্যাস।
দেশ দুটি ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে তিনগুণ বাড়ানোর বৈশ্বিক প্রচেষ্টার প্রতিও সমর্থন জানিয়েছে। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, চলতি মাসের শেষের দিকে দুবাইতে যে জলবায়ু সম্মেলন কপ-২৮ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, সেখানের আগে এটি এক ধরনের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি।
যুক্তরাজ্যের থিংক ট্যাঙ্ক চ্যাথাম হাউসের ফেলো এবং চীনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ বার্নিস লি বলেন, ‘এটি জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।’
ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস ইন্সটিটিউটের ডেভিড ওয়াসকো মিথেন চুক্তিকে একটি ‘প্রধান পদক্ষেপ’ বলে অভিহিত করেন।
তিনি বেলন, ‘চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় মিথেন নিঃসরণকারী দেশ এবং এই গ্যাসের নিঃসরণ রোধে বড় পদক্ষেপ গ্রহণ করা অল্প সময়ের মধ্যে বৈশ্বিক উষ্ণতা কমানোর জন্য অপরিহার্য।’
২। ফেন্টানাইল পাচার রোধ
দু’পক্ষই বলেছে, তারা মাদক পাচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একে অপরকে সাহায্য করবে।
চীন ও যুক্তরাষ্ট্র অবৈধ ফেন্টানাইলের জোয়ার রোধ করার জন্য রাসায়নিক কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে।
এই উপাদানটি অতিরিক্ত মাত্রায় গ্রহণের ফলে মানুষের মৃত্যু অনেক বেড়েছে।
গত বছর প্রায় ৭৫ হাজার মার্কিন নাগরিকের মৃত্যুর পেছনে কারণ ছিল এই শক্তিশালী সিনথেটিক ওপিওড বা কৃত্রিম ওপিওড।
কৃত্রিম ওপিওড হলো এমন পদার্থ যা পরীক্ষাগারে সংশ্লেষিত হয় এবং যেটি মস্তিষ্কের ওই একই অংশে প্রভাব ফেলে যেমনটা কিনা প্রাকৃতিক ওপিওড যেমন, মরফিন, কোডাইন করে থাকে।
এগুলো মূলত বেদনানাশক বা ব্যথা উপশমে কাজ করে।
চীনা উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো শুধুমাত্র এই ওষুধই উৎপাদন করে না বরং ওষুধগুলো তৈরি করার জন্য যেসব রাসায়নিকের প্রয়োজন হয় সেগুলোর উৎসও এই কোম্পানিগুলো।
ব্রুকিংস ইন্সটিটিউশনের আন্তর্জাতিক সংগঠিত অপরাধ বিশেষজ্ঞ ভান্ডা ফেলবাব-ব্রাউন বলেন, ‘চুক্তিটি মূলত এক ধরনের কূটনৈতিক এবং রাজনৈতিক বিবৃতি।’
তবে এর প্রকৃত প্রভাব কেমন হবে সেটি নিয়ে এখনো প্রশ্ন থেকে গেছে।
তিনি বলেন, ‘চীন এই কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে আদৌ কী ব্যবস্থা নেয় সেটাই এখন দেখার বিষয়। তারা কি অন্তত তিনটি কোম্পানির পেছনে লাগবে? নাকি পাঁচটি? পঞ্চাশটি?’
তিনি জানান, তার ধারণা চীন সম্ভবত মাদকবিরোধী সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাবকে, তাদের বৃহত্তর কূটনৈতিক তৎপরতা পরিচালনার জন্য একটি দর কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে থাকবে।
চীন যুক্তরাষ্ট্রে সরাসরি চালান বন্ধ করে দিয়েছে, যার অর্থ বেশিরভাগ অবৈধ বাণিজ্য মেক্সিকো রুট হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা বলন, চীন এ ধরনের পাচার বন্ধ করার জন্য যথেষ্ট ব্যবস্থাগ্রহণ করেনি।
অন্যদিকে চীনের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রে যে ওপিওড মহামারী দেখা দিয়েছে, এর পেছনে কেবল যুক্তরাষ্ট্রই দায়ী।
৩। সামরিক যোগাযোগ পুনঃস্থাপন
দু’দেশ একে অপরের সাথে সামরিক যোগাযোগ পুনরায় শুরু করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। এটি এমন একটি পদক্ষেপ যা মার্কিনিদের প্রত্যাশার তালিকার উপরের দিকে ছিল।
গত বছর মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের তৎকালীন স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি তাইওয়ান সফর করার পর চীন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সামরিক যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।
চলতি বছরের শুরুর দিকে একটি সন্দেহভাজন চীনা গুপ্তচর বেলুন উত্তর আমেরিকার আকাশ জুড়ে ভেসে বেড়াতে দেখা যায়।
পরে যুক্তরাষ্ট্র সেগুলো গুলি করে আটলান্টিক মহাসাগরে নামিয়ে আনে। ওই ঘটনার পর থেকে চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের আরো অবনতি হয়।
