কয়েক দিন আগে মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (MIST) প্রফেসর মো. মোখলেসুর রহমান স্যার আমার হোয়াটসঅ্যাপে একটি ছবি পাঠিয়েছিলেন এবং ফোন করে অনুরোধ করে বলেছিলেন যে, আপনি যেহেতু লেখালেখি করেন, এ ছবিটির ওপর ভিত্তি করে একটা লেখা তৈরি করতে পারেন।
ছবিটি ছিল তিনটি প্রাণীর নিবিড়ভাবে একসময় ঘুমিয়ে থাকা নিয়ে। তিনি বারবার বলছিলেন যদি তিনটি প্রাণী একসঙ্গে থাকতে পারে, তাহলে মানুষ কেন পারবে না।
বর্তমান বিশ্বে যে সংখ্যাক পারমাণবিক বোমা, জীবাণু অস্ত্র, ক্ষেপণাস্ত্র, পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র, জঙ্গি বিমান ও অন্যান্য যুদ্ধাস্ত্র তৈরি হচ্ছে এবং মজুত আছে, সেগুলো দিয়ে এ পৃথিবীকে কয়েক বার ধ্বংস করা যাবে। সেগুলো মানুষ তার স্বজাতির ওপর ব্যবহার করবে। আর এসব যুদ্ধ ও যুদ্ধে ব্যবহূত বিস্ফোরক, ব্যয়িত জীবাশ্ম জ্বালানি, তেজস্ত্রিয়তার কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা ক্রমেই বাড়ছে। মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স
মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব বলা হয়। এর পেছনে অনেক যৌক্তিক কারণ রয়েছে। মানুষ জ্ঞান, বুদ্ধি ও বিবেকের দিক থেকে অন্যদের থেকে আলাদা এবং শ্রেষ্ঠ। কিন্তু বিগত শতাব্দী ও বর্তমান শতাব্দীর মানুষের কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে বিশ্বনেতাদের সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রম দেখে একটু ভিন্নতর চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। এখন মনে হয়, সময় এসেছে মানুষকে প্রাণিকুল, উদ্ভিদরাজি ও অন্যান্য ক্ষুদ্র্রাতিক্ষুদ্র উদ্ভিদ ও প্রাণী থেকে শিক্ষা নেওয়ার।
যুদ্ধের কারণে কেউ কেউ তাদের প্রভুত্ব ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় ব্যস্ত থাকে। কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে, কোনো দেশ বা জাতির সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকতে হয়। ভাবমূর্তির সংকট হলে সে জাতি বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে চলতে পারে না এবং পারবে না। জাতিসংঘের সুদানের দারফুরে ইউনামিড মিশনে বাংলাদেশ ফরমড পুলিশ ইউনিটের ডেপুটি কমান্ডার হিসেবে প্রায় ১৩ মাস আল-জেনিনা মরুভূমিতে কর্মরত ছিলাম। খুব কাছ থেকে মানুষের অমানবিক জীবনযাপন দেখেছি, দেখেছি শিশু সৈনিকের যুদ্ধসাজ, দেখেছি বাড়িঘরের শতসহস্র গুলির ক্ষতের চিহ্ন।
সাম্প্রতিক রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও সর্বশেষ ইসরাইল-হামাস যুদ্ধের ভয়াবহতা ও নির্মমতা পৃথিবীর সভ্যতা, নৈতিকতা, মানবতাকে ভূলুণ্ঠিত করেছে। ফিলিস্তিনে ও ইউক্রেনে মানবতা ব্যাপকভাবে অবনমিত হয়েছে ও হচ্ছে। সাম্প্রতিক যুদ্ধের কারণে জাতিসংঘ, জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থা ও বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থাসমূহ ব্যর্থ হওয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে গেছে! জাতিসংঘের অনেক সফলতাও আছে। কিন্তু জাতিসংঘের পাশাপাশি বিশ্বনেতারা তথা বিশ্ববিবেক জাগ্রত হলেই এসব যুদ্ধ বন্ধ করা যাবে।
একটা সূত্র থেকে জানলাম, যুদ্ধে ইউক্রেনের ৭ লক্ষাধিক সৈন্য ও সার্ভিসম্যান মারা গেছেন, অন্যদিকে রাশিয়ার পক্ষে ৩ লাখ ১৫ হাজার সৈন্য মারা গেছেন। আর সাধারণ মানুষের মৃত্যু, আহত হওয়া ও পঙ্গু হওয়া তো হিসাবের বাইরে। অন্য এক সূত্র থেকে জানা যায়, ইসরাইলের বোমায় ফিলিস্তিনের অনেক মানুষ, বিশেষ করে শিশু, নারী মারা গেছে ও ধ্বংসস্তূপের নিচে বহু শিশু, নারী ও অন্যদের মৃতদেহ পড়ে রয়েছে। রুয়ান্ডার এক গেরিলা কমান্ডার পরবর্তী সময়ে রুয়ান্ডার সরকারের এসপি হয়ে জাতিসংঘে চাকরি নিয়ে আমাদের দারফুরের বাংলাদেশ কনটিজেন্ট ইন্সপেকশনে এসেছিলেন। তিনি একটা গল্প বলছিলেন, গল্পটি ছিল রুয়ান্ডার যুদ্ধকালীন, যেখানে স্বামী-স্ত্রী ভিন্ন গোত্রের ছিলেন, আর সন্তান জন্ম হলো মায়ের চেহারার আদল নিয়ে, সেজন্য বাবা সন্তানকে হত্যা করল। রুয়ান্ডার সে কমান্ডার আরো বলেছিলেন যুদ্ধমানুষকে অসুস্থ (সিক) করে ফেলে। সেজন্য পৃথিবীর যে কোনো সমস্যা দ্রুত সমাধান করে নেয়া উচিত। আশ্রয় শিবিরে বছরের পর বছর বাস করার কারণে মৌলিক চাহিদা থেকে মানুষ বঞ্চিত হয়। উপরন্তু মানুষ তার মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। সে কারণে সে যে কোনো কিছুই করতে পারে।
