বাংলাদেশের নির্বাচন অবাধ সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিদেশি পর্যবেক্ষকরা। নির্বাচন কমিশনের আমন্ত্রণে আসা এসব পর্যবেক্ষক ভোটের শান্তিপূর্ণ পরিবেশেরও প্রশংসা করেন।
পর্যবেক্ষকদের মধ্যে রাশিয়া ও ফিলিস্তিনের টিম সেসব দেশের সরকার অনুমোদিত হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার নাগরিকরা সংশ্লিষ্ট সরকারের প্রতিনিধিত্ব করছেন না।
রোববার সন্ধ্যায় রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে সংবাদ সম্মেলনে ওআইসিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বেশ কয়েকটি দেশের পর্যবেক্ষক এ মত প্রকাশ করেন।
তবে ঢাকা-১৭ আসনের অধীন রাজধানীর বনানী মডেল স্কুল কেন্দ্রে এক বিদেশি পর্যবেক্ষক আসার আগে ভোটারের দীর্ঘ সারি তৈরি হলেও তিনি চলে যাওয়ার পরই কেন্দ্রটি প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়। সেখানে বেলা ১১টা ২৫ মিনিটের দিকে হঠাৎ অনেক নারী ভোটার লাইন দিতে থাকেন। একপর্যায়ে লাইনটি স্কুলমাঠ পেরিয়ে সড়কে চলে যায়। কিছুক্ষণ পর স্কুলটিতে আসেন বেসরকারি সংস্থা গোল্ড ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজির প্রেসিডেন্ট এলি এম গোল্ড। তিনি ভোটকেন্দ্র ঘুরে দেখেন। এরপর সাংবাদিকদের বলেন, অনেক ভোটার এসেছেন। ভালো ভোট হচ্ছে। বাংলাদেশের নির্বাচন অবাধ
এলি গোল্ড চলে যাওয়ার পরপরই ওই স্কুলে ভোটারের দীর্ঘ সারি প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়। লাইনে দাঁড়ানো নারীরা বের হয়ে সাংবাদিকদের জানান, তাদের রিকশা ভাড়া করে কড়াইল বস্তি এলাকা থেকে এনেছিলেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের নারী নেত্রীরা।
সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন কংগ্রেসের সাবেক সদস্য জিম বেটস বলেছেন, ‘নির্বাচন শান্তিপূর্ণ, অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে। বাংলাদেশে ভোট গ্রহণের সময় পৃথিবীতে সবচেয়ে কম। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে আট ঘণ্টা ভোট হয় না।’ এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের আরেক পর্যবেক্ষক এবং আমেরিকান গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজিসের প্রধান নির্বাহী আলেক্সান্ডার গ্রে বলেছেন, ‘আমি নিজের চোখে যা দেখেছি, তা হচ্ছে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। নির্বাচন দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হয়েছে। ভোটাররা উৎসাহের সঙ্গে ভোটকেন্দ্রে গেছেন।’ তিনি মুন্সীগঞ্জ-১ আসনের বিভিন্ন কেন্দ্র পরিদর্শন করেন।
গাজীপুরের বেশ কয়েকটি ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করে যুক্তরাষ্ট্রের পর্যবেক্ষক দল। এ সময় তারা কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন। তবে তারা যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রতিনিধিত্ব করছেন না।
রাশিয়ার কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনার অ্যান্দ্রে ওয়াই শুটব বলেছেন, ‘আমি বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র পর্যবেক্ষণ করেছি। নির্বাচনের আয়োজন চমৎকার ছিল। নির্বাচন অবাধ, স্বচ্ছ এবং বিশ্বাসযোগ্য উপায়ে সম্পন্ন হয়েছে। গণমাধ্যমকর্মীরা স্বাধীনভাবে খবর সংগ্রহ করতে পেরেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়া কার্যকর। নির্বাচনের দীর্ঘ ঐতিহ্য বাংলাদেশের আছে। ওই ঐতিহ্যের হাত ধরে বাংলাদেশের গণতন্ত্র স্থিতিশীলভাবে এগোচ্ছে।’
সংবাদ সম্মেলনে ওআইসির নির্বাচন ইউনিটের প্রধান শেখ মোহাম্মদ বন্দর বলেছেন, ‘পর্যবেক্ষক হিসেবে সহিংসতার কোনো চিহ্ন আমাদের চোখে পড়েনি। আমি অবাক হয়েছি, দোকানপাট বন্ধ কেন! সড়কে কোনো মানুষ দেখা যায়নি। শহর ছিল শান্ত।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর থেকে এসেছি, গাজার মতো সেখানে যুদ্ধ চলছে। আমাকে দু’বার প্রশ্ন করা হয়েছে– আপনি এমন একটি দেশ থেকে এসেছেন? আসা কি গুরুত্বপূর্ণ এবং কোনো চাপ ছিল কিনা? তিন মাস আগে জিম্বাবুয়েতে থাকার সময় আমন্ত্রণ পেয়েছি। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। আমি আরব ইলেক্টোরাল ম্যানেজমেন্ট বডির সঙ্গে সম্পৃক্ত। আমার দেশের পাশাপাশি সংগঠনেও প্রতিবেদন জমা দেব। এ কারণে এ আমন্ত্রণে সাড়া দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ ছিল। নির্বাচনী পরিবেশ দেখে আমরা সন্তুষ্ট। আমরা ভালো নির্বাচনী প্রক্রিয়া দেখেছি।’
আরেক প্রশ্নের জবাবে শেখ মোহাম্মদ বলেন, ‘আমি এখনও জানি না কত শতাংশ ভোট পড়েছে। সকালে যখন আমরা কেন্দ্র পরিদর্শন করি, তখন ভোটার উপস্থিতি খুবই কম ছিল। ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে এ দেশে কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে এ বিষয়ে আমি মন্তব্য করতে পারি না।’
ফিলিস্তিনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার হাশিম কুহাইল বলেন, ‘আমরা বেশ কয়েকটি ভোটকেন্দ্র ঘুরে দেখেছি। ভোট শান্তিপূর্ণভাবে হয়েছে।’
কানাডার লিবারেল পার্টির এমপি চন্দ্রকান্ত আর্য বলেছেন, ‘ভোট সুষ্ঠুভাবে শেষ হয়েছে। ভোটে রেকর্ড সংখ্যক নারী ভোটার উপস্থিত ছিলেন। আমরা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী ভোটকেন্দ্রে গিয়ে লোকজনের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেয়েছি। সুষ্ঠু ভোট প্রক্রিয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনকে অভিনন্দন জানাই।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কানাডাতেও ভোট ৪৩ শতাংশ পড়েছিল, সেটা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলেনি। জনগণ ভোট দিতে পারছে কিনা, এটাই দেখার বিষয়। ভোটার কত শতাংশ এলো তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যারা এসেছে, তারা ঠিকমতো ভোট দিয়েছে। তাই এ নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কারণ নেই।’ তিনিও কানাডা সরকারের প্রতিনিধি নন।
নাইজেরিয়ার সিনেটর প্যাট্রিক সি বলেছেন, ‘ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ জেলার বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করেছি। স্থানীয়দের উৎসাহের সঙ্গে ভোট দিতে দেখেছি।’
সাউথ এশিয়া ডেমোক্রেটিক ফোরামের নির্বাহী পরিচালক পাওলো কাসাকা বলেছেন, ‘নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে। তবে প্রধান বিরোধী দল এলে নির্বাচন আরও অংশগ্রহণমূলক হতো। যারা নির্বাচন বয়কট করেছে, তাদের দ্রুত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াতে ফিরে আসা উচিত।’ পর্তুগালের নাগরিক কাসাকা বলেন, ‘আমি মর্মাহত যে, সহিংসতা এখনও ঘটছে। দ্বিতীয় যে কারণে আমি দুঃখিত, সেটি হচ্ছে বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য না হওয়া। এখানে ঐকমত্য হলে পূর্ণ অংশগ্রহণ হতো।’
দুপুরে গাজীপুরের টঙ্গীর দুটি ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করেছে ভারতের চার সদস্যের প্রতিনিধি দল। টঙ্গীর বিসিক এলাকার শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্র ও টঙ্গী সরকারি কলেজ কেন্দ্র পরিদর্শন করেন তারা। এ সময় ভোটকেন্দ্রে প্রার্থীর পক্ষে থাকা এজেন্ট ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলেন প্রতিনিধি দলের সদস্যরা।
পরিদর্শনে ভারত প্রেস ক্লাবের সভাপতি গৌতম লাহিড়ী, সাবেক আমলা অমিতাভ রায়, সাংবাদিক ড. সুরেশ চন্দ্র শুক্লা ও ইন্ডিয়া টুডের সম্পাদক এস ভেঙ্কট নারায়ণ ছিলেন।
টঙ্গীর শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা মো. জাকির বলেন, ভারতীয় পর্যবেক্ষকরা কেন্দ্রে থাকা প্রার্থীদের এজেন্ট ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলেন। তবে তারা ভোটার উপস্থিতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন।
গৌতম লাহিড়ী বলেন, ঢাকা থেকে কাজ শুরু করেছি। এখানকার বেশ কিছু কেন্দ্র পরিদর্শন শেষে গাজীপুরের দুটি কেন্দ্র ঘুরে দেখেছি। এসব কেন্দ্রে উপস্থিতি ছিল কম। নির্বাচন বয়কটকারীরা সহিংসতা করবে কিনা এমন আশঙ্কা মানুষের কম। আশা করছি, বেলা বাড়ার সঙ্গে গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষ কেন্দ্রে আসবেন এবং ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।
