পৌষের শেষ দিনে কুয়াশার সঙ্গে হাড় কাঁপানো শীতে জনজীবন হয়ে পড়েছে বিপর্যস্ত। কয়েক দিন ধরে মিলছে না সূর্যের দেখা। সন্ধ্যার পরেই নেমে যাচ্ছে তাপমাত্রার পারদ। শীতের দাপটে রীতিমতো কাবু দিনমজুর ও খেটে খাওয়া মানুষ। কুয়াশায় ব্যাহত হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। হিম ঠান্ডা থেকে বাঁচতে নেই পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র। অন্য বছর শীতবস্ত্র বিতরণে সাড়া মিললেও এবার শীতার্তদের পাশে তেমন কেউ নেই।
সরকারি সামান্য বরাদ্দের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে কোটি দরিদ্র মানুষকে। সরকার প্রতি জেলায় অপ্রতুল কম্বল বরাদ্দ দিলেও শীতের কারণে যাদের রুটিরুজি বন্ধ, তাদের কথা কেউ ভাবছে না। ঘন কুয়াশায় কৃষকের মাথায় হাত পড়লেও কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে নেই কোনো প্রণোদনা। দুর্যোগপূর্ণ এমন আবহাওয়ায় দেশ যখন স্থবির, তখন এ নিয়ে নেওয়া হয়নি আলাদা কোনো উদ্যোগ।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাসকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে ধরা হলেও তীব্র শীত নিয়ে নেই আলাদা প্রস্তুতি। শীতে কর্মহীন মানুষের জন্য নেই বিশেষ বরাদ্দ। পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র বরাদ্দের পাশাপাশি ত্রাণ কার্যক্রম হাতে নেওয়া দরকার বলে মনে করেন তারা।
গতকাল দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা শনিবারের চেয়ে আরও খানিকটা কমেছে। রোববার দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে দিনাজপুরে ৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শনিবার দিনাজপুরেই দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৮ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রাজধানীতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিশোরগঞ্জ, পাবনা, দিনাজপুর ও চুয়াডাঙ্গায় মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। আবহাওয়া অফিস বলছে, শীতের এই তীব্রতা আজ সোমবারও থাকতে পারে। তবে আজ থেকে দেশের কিছু এলাকায় সূর্যের মুখ দেখা যেতে পারে। সে জন্য অপেক্ষা করতে হবে দুপুর পর্যন্ত।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. তরিফুল নেওয়াজ কবির বলেন, আগামীকাল মঙ্গলবার থেকে তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করবে। বুধবার থেকে দেশের কিছু স্থানে বৃষ্টিরও সম্ভাবনা আছে। বৃষ্টির পর কুয়াশা অনেকটা কেটে যাবে। শীতও কমতে পারে। কুয়াশার সঙ্গে হাড় কাঁপানো
শীতের দাপটে নিম্ন আয়ের মানুষ পড়েছে বিপাকে। কারওয়ান বাজার এলাকার ফুটপাত ঘুরে দেখা গেছে, অসংখ্য মানুষ ফুটপাতের ওপরই খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাচ্ছেন। তেমনই একজন সায়রা খাতুন। তিনি বলেন, ‘এত বড় নির্বাচন গেল, তখনও কেউ কিছু দেয় নাই। নির্বাচনের পরেও কেউ কিছু দিচ্ছে না। এই শীতের মধ্যে আমরা অনেক কষ্ট করছি। কোনো কিছু পাই নাই। কম্বলও পাচ্ছি না। একটা চাদর গায়ে দিয়ে থাকছি।’
পান্থপথে ফুটপাতে বাস করা হালিমা বেগম বলেন, ‘একটা পাতলা কম্বল নিয়ে ঘুমানো যায় না। বাচ্চাটা সারা রাত শীতে কাঁপে। টাকাপয়সাও নাই যে শীতের লাগি গরম কিছু কিনমু। বাজারে জিনিসপত্রের দামও অনেক, খাওয়ার জিনিস কিনতেই অনেকবার ভাবা লাগে।’
মোহাম্মদপুরে থাকেন ভ্যানচালক খসরু মিয়া। তিনি বলেন, ‘গরিব মানুষের শীতও যা, গরমও তা। আমাদের তো দেখার কেউ নাই।’
রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে ফুটপাতে বাস করা আব্দুল মজিদ বলেন, ‘অন্য বছর শীতের শুরুতেই অনেকে রাতে কম্বল বিতরণ করত। এবার কারও দেখা নেই।’
রাজধানীতে শীত কিছুটা কম পড়লেও উত্তরের জনপদে ঠান্ডায় মানুষের কাহিল অবস্থা। সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টের পাশাপাশি কোল্ড ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকে। গত ছয় দিনে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কোল্ড ডায়রিয়া আর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ১৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছে তিন শতাধিক শিশু। কনকনে শীতে খড়কুটো জ্বালিয়ে আগুন পোহাতে গিয়ে দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ৪৪ জন দগ্ধ রোগীর মধ্যে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দু’জনের মৃত্যু হয়েছে।
একটি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, উত্তরের প্রতিটি জেলায় হতদরিদ্র শীতার্ত মানুষের সংখ্যা গড়ে দুই লাখের ওপর। ১৬ জেলায় ৩২ লাখের বেশি হতদরিদ্র মানুষ আছে। এসব মানুষের পাশে এখন পর্যন্ত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সেভাবে এগিয়ে আসেনি। এ পর্যন্ত শীত উপদ্রুত প্রতি জেলায় সরকারিভাবে গড়ে ৩০ হাজার কম্বল বিতরণ করা হয়েছে।
রংপুর ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোতালেব হোসেন জানান, প্রতিটি জেলায় স্থানীয়ভাবে গড় চাহিদা দুই লাখ পিস শীতবস্ত্র। এর বিপরীতে সরকারি বরাদ্দ এসেছে ৫০ থেকে ৫৮ হাজার পিস। এসব শীতবস্ত্র ইতোমধ্যে ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পঞ্চগড়ের পাঁচ উপজেলার প্রায় ১২ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে অন্তত চার লাখ নিম্নবিত্তের শীতবস্ত্র, খাদ্য ও অর্থ সহায়তা দরকার। জেলা প্রশাসক জহিরুল ইসলাম জানান, তারা এ পর্যন্ত ৩০ হাজারের মতো কম্বল বিতরণ করেছেন।
কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইদুল আরিফ জানান, তারা ৫২ হাজার কম্বল বরাদ্দ দিয়েছেন। এর মধ্যে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৪৩ হাজার বিতরণ করেছেন। আসলে ঠিক কত লোকের সহায়তা দরকার, সেই তথ্য আমাদের কাছে নেই। আমাদের ভালো ডাটাবেজ না থাকায় এমনও হয় একজন একাধিকবার পান, আরেকজন পান না।
কুড়িগ্রামের জনসংখ্যা ১৮ লাখ। জেলার এনজিওকর্মী রুকনুজ্জামান রুকু বলেন, আমাদের হিসাবে জেলার কমপক্ষে চার লাখ লোকের এখন কাজ নেই। যাদের হাতে কাজ আছে, তারাও শীতের কারণে করতে পারছেন না। তাই গরম কাপড় ছাড়াও তাদের খাদ্য ও অর্থ সহায়তা দরকার।
