ক্ষণস্থায়ী এ দুনিয়ার জীবন তা সত্ত্বেও মানুষ অধিক ধনসম্পদ, খ্যাতি ও সম্মান লাভে লালায়িত হয়ে হেন অপকর্ম নেই করতে দ্বিধা বোধ করে। দুনিয়ার রঙ-তামাশায় মদমত্ত হয়ে মানুষ মহান প্রতিপালক আল্লাহকেই ভুলে যায়। তাই দয়ালু ও মহাদাতা রাব্বুল আলামিন সূরা তাকাছুরে মানুষকে সতর্ক করেছেন। ১. ‘আলহাকু মুত্তাকাছুর- প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদের গাফেল করে রেখেছে’। ২. ‘হাত্তাঝুরতুমুল মা কবির- যতক্ষণ না তোমরা কবরে উপনীত হবে।
বহুল পঠিত এ সূরার ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে-
“হে অপরিণামদর্শী সীমালঙ্ঘনকারী মোহমত্ত মানুষ শোনো! যারা খেলাধুলায় মত্ত- জনবল, ধনবল ও পার্থিব ভোগের উপকরণের আধিক্যে গর্বিত; অথচ একদিন এগুলো ছেড়ে যেতেই হবে সে কথা বিস্মৃত, তারা শোনো! বর্তমান জীবনের অব্যবহিত পরে যে জীবন, তাকে যারা ভুলে বসে আছো, তারা শোনো! সম্পদ ত্যাগ করে সঙ্কীর্ণ একটি গর্তে আশ্রয় নিতে হবে, তারা শোনো! প্রতিযোগিতা ও অহঙ্কার এবার থামাও। জাগো ও চোখ মেলে তাকাও। ‘অতিরিক্ত অর্জনের নেশা তোমাদেরকে উদাসীন করে দিয়েছে। কবরের সাক্ষাৎ না পাওয়া পর্যন্ত তোমাদের এ অবস্থাই চলতে থাকবে। প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে উদাসীন করে দিয়েছে, এমনি করেই তোমরা কবরের কাছে গিয়ে হাজির হবে।’ দুনিয়ার জীবনে দেখা দেয়া আলোর ঝলক একসময় শেষ হয়ে যায় এবং তার জীবনের ক্ষুদ্র পাতাটিও একসময় উল্টানো সম্পন্ন হয়।’’ (তাফসির ফি জিলালিল কুরআন)
মহান আল্লাহ ও প্রিয় নবী সা: সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করার বিকল্প নেই। এক হাদিসে আল্লাহর রাসূল সা: বলেছেন, ‘যদি আমি যা জানি তা তোমরা জানতে তাহলে হাসতে কম কাঁদতে বেশি।’ (বুখারি) ক্ষণস্থায়ী এ দুনিয়ার জীবন
অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা আল্লাহর বাণী পবিত্র কুরআনুল কারিম ও আল্লাহর হাবিবের হাদিস পাঠ থেকে নিজেদের বঞ্চিত করি। আধুনিক শিল্প সাহিত্য কাব্য গল্প উপন্যাস চর্চায় মানুষ কতই না আগ্রহী; কিন্তু আল্লাহ তায়ালার কালাম পাঠে অজ্ঞতা-অলসতা আমাদের ছেয়ে আছে। শুধু কি তাই, ইলম অর্জনের জন্য আমাদের কৃপণতা-বখিলতা সীমাহীন। কুরআন শিক্ষার জন্য অর্থের ব্যয় যেন আমাদের কাছে জরিমানা। কুরআনুল কারিমের শিক্ষককে মাসে মাত্র ৭০০ টাকা দিতে আমাদের কলিজা পোড়ে। সেই আমরাই আবার পার্থিব শিক্ষার জন্য সাত সাবজেক্টে সাত দ্বিগুণে ১৪ হাজার টাকা গুনতে দ্বিধা করি না।
কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন- ‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার আল্লাহ তায়ালা তাদের সম্মান বৃদ্ধি করে দেবেন এবং তাদেরকেও (বাড়িয়ে দেবেন) যাদেরকে ইলম দেয়া হয়েছে। আর আল্লাহ তোমাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে পূর্ণ অবগত আছেন।’ (সূরা আল-মুজাদালাহ-১১)
সাত আসমান ও জমিনের মালিক, সর্বস্রষ্টা ও সর্বদ্রষ্টা আল্লাহ তায়ালা কুরআন মাজিদে বলেছেন- ‘(হে রাসূল!) আপনি বলুন, হে আল্লাহ! আপনিই সার্বভৌম শক্তির অধিকারী। আপনি যাকে ইচ্ছা রাজ্য দান করেন এবং যার কাছ থেকে ইচ্ছা রাজ্য ছিনিয়ে নেন এবং যাকে ইচ্ছা সম্মান দান করেন আর যাকে ইচ্ছা অপমানে পতিত করেন। আপনারই হাতে রয়েছে যাবতীয় কল্যাণ। নিশ্চয়ই আপনি সর্ববিষয়ে ক্ষমতাশীল।’ (সূরা আলে ইমরান-২৬)
আল্লাহ তায়ালার বড়ত্ব, মহত্ত্ব ও সর্বোপরি তাঁর পরিচয় জানতে হলে কুরআনুল কারিম ও হাদিসের জ্ঞানার্জন আবশ্যক। আল্লাহ তায়ালা তৌফিক না দিলে তা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। তাই তো রাহমানুর রাহিম মহান আল্লাহ কঠিন কাজকে সহজ করার জন্য দোয়া শিখিয়েছেন। কুরআনুল কারিমে আয়াত নাজিল করেছেন- ‘রব্বি জিদনি ইলমা’ অর্থাৎ ‘হে আমার প্রতিপালক! আমার জ্ঞান বাড়িয়ে দিন।’ (সূরা তোয়াহা-১১৪)
আল্লাহর হাবিব মুহাম্মাদ সা: বলেছেন- ‘প্রতিটি মুসলিমের ওপর ইলম শিক্ষা করা ফরজ।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ-২২৪) ফরজ ইলম আবার দুই প্রকার। ফরজে আইন ও ফরজে কিফায়া। ফরজে আইন হলো- এমন ফরজ, যা সুনির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর ফরজ হয়। যাদের ওপর ফরজ হয়, তাদের প্রত্যেককেই তা আদায় করতে হয়। যেমন- কালিমা, সালাত, সিয়াম, হজ ও জাকাত আদায় করা। সেই সাথে এসব বিষয়ে জ্ঞানার্জন করতে হবে। তবে এর মধ্যে হজ-জাকাত আদায় করা শুধু সামর্থ্যবানের জন্য ফরজ করা হয়েছে।
আর ফরজে কিফায়া হলো- যদি কারো দ্বারা কাজটি সম্পাদন করা হয়ে যায়, তাহলে আইন বা ফরজটির বাধ্যবাধকতা সবার ওপর থেকে রহিত হয়ে যায়। যেমন- জানাজার সালাত, সৎকাজের আদেশ, শরিয়তের বিশেষ জ্ঞানার্জন প্রভৃতি। ইবনে উমার রা: বর্ণনা করেন, ‘আমি আল্লাহর রাসূল সা:-কে বলতে শুনেছি, একদা আমি নিদ্রাবস্থায় ছিলাম। তখন (স্বপ্নে) আমার কাছে এক পেয়ালা দুধ নিয়ে আসা হলো। আমি তা পান করলাম। এমনকি আমার মনে হতে লাগল যে, সে তৃপ্তি আমার নখ দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে। অতঃপর অবশিষ্টাংশ আমি উমার ইবনুল খাত্তাবকে দিলাম। সাহাবিরা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এ স্বপ্নের কী ব্যাখ্যা করেন? তিনি জবাবে বললেন- তা হলো জ্ঞান।
