ফজরের নামাজ পড়ে কুয়াশাছন্ন

ভোর ৬টায় অন্ধকার কেটে হালকা আলো ফুটতে শুরু করেছে। মুসল্লিদের সঙ্গে ফজরের নামাজ পড়ে কুয়াশাছন্ন মেঠো পথ দিয়ে মাঠের দিকে ছুটছে আবুজার রহমান, রফিকুল ইসলাম, তৌহিদুর রহমান, ওহিদুল ইসলাম ও আজিজুর রহমান। 

তারা সম্পর্কে একে অপরের চাচাতো-খালাতো ভাই। মাঠে গিয়ে খেজুর গাছ থেকে যে যার মতো রস সংগ্রহে ব্যস্ত। কেননা সকাল সকাল রস জ্বালিয়ে গুড় তৈরি করে বাজারে নিতে হবে। 

এমন চিত্রটি যশোরের চৌগাছা উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের ভগবানপুর গ্রামে। ১৩ জানুয়ারি ভোরে এ গ্রামটিতে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই ছোট-বড় চুলায় চলছে রস জ্বাল দেওয়ার কাজ। এ গ্রামের অধিকাংশ পুরুষই কৃষি কাজের পাশাপাশি গাছি পেশায় নিয়জিত আছে। 

মাঠের খেজুর গাছ থেকে রস নামিয়ে তা বাড়িতে আনা হয়। এরপর উঠানের বড় উনুনে তাফাল বসিয়ে তাতে ঢালা হয়। আস্তে আস্তে জ্বাল দিতে হয় ও রস নাড়তে হয়। এভাবেই তৈরি হয় ঝোলা গুড় এবং পাটালি গুড়। এ প্রক্রিয়াটি করতে প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা সময় লাগে। এর সে গুড় পাটালি গুলো দূর দুরন্ত থেকে অনেকে কিনতে আসে আবার অনেকে ভাড়ে করে হাটবাজার নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে।

গাছিরা জানান, গত বছর ২০২৩ সালের নভেম্বর মাস থেকেই গাছ কাটা এবং রস সংগ্রহের মৌসুম শুরু হয়। তবে সে সময় শীতের মাত্রা কম থাকায় রসের পরিমাণও কম ছিল। ফলে রস গুড় প্রেমীদের চাহিদা মতো সরবরাহ করা সম্ভব হতো না। তবে জানুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে যশোরে শীতের তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে। আগের থেকে তুলনামূলক রস ঝরার পরিমাণও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে ক্রেতাদের চাহিদা মিটিয়ে লাভের মুখ দেখছেন গাছিরা। 

ইলিশমারী গ্রামের রফিকুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমরা বছরের অন্যান্য সময় দিনমুজুরির কাজ করি। এই শীত মৌসুমে খেজুর গাছ কেটে রস সংগ্রহ করতে নামি। আমার চাচাতো-খালাতো ভাইয়েরাও এ পেশা ধরে রেখেছে। ফজরের নামাজ পড়ে কুয়াশাছন্ন

তিনি বলেন, আমার এখানে ৩৫টা গাছ আছে। প্রতিদিন ৫ থেকে ৬ ভাড় করে গুড় বিক্রি করি। গুড়ের প্রকারভেদে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। রস প্রতি ভাড় ২০০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হয়। 

আবুজার রহমান নামে ওই গ্রামের এক গাছি ঢাকা পোস্টকে বলেন, সকাল হলেই এই গ্রামের মধ্যে দিয়ে হাঁটলে রসের মিষ্টি গন্ধে প্রাণ ভরে যায়। প্রতিটা বাড়িতে কালটা যেন একটা উৎসবের সকাল। চুলায় গুড় জ্বাল দেওয়ার পর শিশুরা তাফালের পাশে বসে কাঠি, চামচ দিয়ে মিঠাই খায়। বিষয়টি দেখে আমাদেরও ভালো লাগে।

গাছিদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে সকাল ৮টা বাজতেই গাছির বাড়িতে হাজির বিধান ঘোষ নামের এক শিক্ষক। তিনি রস আর গুড় কিনতে এসেছেন। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, বাড়িতে মেয়ে, নাতি-পুতিরা এসেছে। তারা রসের পিঠে আর গুড় খেতে চেয়েছিল। তাই আগে থেকে এখানে বলে রেখেছিলাম। এখন রস গুড় নিত এসেছি। বর্তমানে এই গাছ কাটা পেশায় কেউ আসতে চায় না। তাই রস গুড় পাওয়া দুর্লভ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটির বাজারমূল্য বৃদ্ধি এবং গাছিদের সহয়তা করলে এটি দেশের জন্য একটা ঐতিহ্য হিসেবে বেঁচে থাকবে।

 গ্রামে পৌঁছালো যুক্তরাষ্ট্রে গুলিতে নিহত আবিরের মরদেহ

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments