সুন্দরবনের অভয়ারণ্যে মাছ ধরা নিষিদ্ধ। তবে এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সেখানে অবাধে মাছ ধরা চলে । এমনকি বেশি মাছ ধরার জন্য তারা সুন্দরবনের জলে বিষ নিক্ষেপ। এর পেছনে রয়েছে একটি শক্তিশালী চক্র। ঘুষ নিয়ে তারা সংরক্ষিত এলাকায় মাছ ধরার অনুমতি দেয়। বনের খাল ও নদীগুলো জেলেদের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়। বনকর্মী ছাড়াও এই চক্রে রয়েছে মাছ ব্যবসায়ী ও স্থানীয় প্রভাবশালী লোকজন।
মো. শাহজাহান পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলার বাসিন্দা ছিলেন। মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। ঘুষ দিয়ে সুন্দরবনের অভয়ারণ্যে যেসব জেলে মাছ ধরতে যান, শাহজাহান তাদের একজন।। তিনি পরিবারের দারিদ্র্যের কথা তুলে ধরে বলেন, আমি যদি বনে মাছ না ধরি তাহলে আমার পরিবার টিকতে পারবে না। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুষের পরিমাণ বাড়তে থাকে এবং শাহজাহান বলেন, এ বছরও পূর্ণিমায় ১০ হাজার টাকা এবং অমাবস্যায় ৫ হাজার টাকা দিয়েছি।
বাংলাদেশ অংশে সুন্দরবন আয়তন ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার। ১৯৯৬ সালে এই বনের ১ লাখ ৩৯ হাজার ৬৯৯.৪৯৬ হেক্টর এলাকাকে সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করা হয়। ২০১৭ সালে, অভয়ারণ্যের স্কেল প্রসারিত করা হয়েছিল। সংরক্ষিত এলাকার মোট আয়তন প্রায় ৩,২০০ বর্গকিলোমিটার। খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দো বলেন, সুন্দরবনের অর্ধেকের বেশি এখন সংরক্ষিত এলাকা।
বন্যপ্রাণী (সুরক্ষা ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২-তে বলা হয়েছে, “‘অভয়ারণ্য’ অর্থ কোনো এলাকা যেখানে বন্যপ্রাণী ধরা, মারা, গুলি ছোড়া বা ফাঁদ পাতা নিষিদ্ধ এবং মুখ্যত বন্যপ্রাণীর নিরাপদ বংশবিস্তারের লক্ষ্যে সকল প্রাকৃতিক সম্পদ, যেমন– উদ্ভিদ, মাটি ও পানি সংরক্ষণের নিমিত্তে ব্যবস্থাপনা করা হয়।” এ আইনের চতুর্থ অধ্যায়ের ১৪(১) ধারায় উল্লেখ রয়েছে, কোনো ব্যক্তি অভয়ারণ্যে চাষাবাদ, শিল্পকারখানা স্থাপন, উদ্ভিদ আহরণ ও ধ্বংস করতে পারবেন না। বন্যপ্রাণীকে বিরক্ত বা ভয় দেখানো এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল বিনষ্ট হতে পারে এরূপ রাসায়নিক ও গোলাবারুদ ব্যবহার করতে পারবেন না। কিন্তু সুন্দরবনে এই আইনের লঙ্ঘন হচ্ছে হরহামেশা।
এদিকে, অভয়ারণ্যের এলাকার বাইরে বনের অন্যান্য অংশে প্রবেশ এবং প্রতি বছরের জুন, জুলাই এবং আগস্ট মাসে মাছ ধরা নিষিদ্ধ। তবে নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও অনেক জেলে বনে গিয়ে মাছ ধরছে। দালালদের ঘুষ দিয়ে এটা সম্ভব।
গত ২০ আগস্ট সুতারখালী ইউনিয়ন পশ্চিম বন বিভাগের জেলে সোহেল খোলাদার নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও সুন্দরবনে নৌকা থেকে মাছ ধরতে যান। দুটি নৌকায় চারজন ছিলেন। এক সপ্তাহে তিনি প্রায় ২৫ হাজার টাকার মাছ ধরেন। অনেক জেলে মাছ ধরার সময়কাল বেছে নেয়। কারণ এ সময় বনে কোনো দর্শনার্থী থাকে না; বিপদ ছাড়াই মাছ ধরা যায়।
সুন্দরবন শরণচুলা এবং চাম্পাই পর্বতশ্রেণীতে বিভক্ত। এই দুটি এলাকায় ৭টি স্টেশন এবং৩০টি চেকপয়েন্ট রয়েছে। পশ্চিম বিভাগের খুলনা পর্বতমালায় পাঁচটি ঘাঁটি এবং ২২টি ফাঁড়ি রয়েছে। সুন্দরবনে ৮০৩ জন বনরক্ষী মোতায়েন রয়েছে। খুলনা জেলা বন সংরক্ষক মিহির কুমার দেব জানান, এ সংখ্যা খুবই কম। তিনি ব্যাখ্যা করেছেন যে নিষিদ্ধ বনে প্রবেশের চেষ্টাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং এই ধরনের অভিযোগ মরুভূমির পর্যায়ে ছিল না। অভিযোগ পেলে আমরা বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব।
এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সুন্দরবনের নদী ও খালে মাছ ধরার বিষয়ে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহার বলেন, ‘আমি শুনেছি কিছু গোষ্ঠী এ ধরনের কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। বনের সমস্ত সেচ খাল পরিচালনা করার জন্য আমাদের সেই জনবল নেই, তাই সুন্দরবনের সম্পদ রক্ষায় আমাদের সকলকে সতর্ক থাকতে হবে।
সুন্দরবনের টেকসই উন্নয়ন নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন: ইউনেস্কো
