আমরা যে পরিস্থিতিতেই পড়ি না কেন, আমাদের সর্বদা সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। কারণ আমরা সৃষ্টিকর্তার রহমতে রক্ষা পেয়েছি। আমাদের সাফল্য সৃষ্টিকর্তার অসীম অনুগ্রহের ফল। কিন্তু মাঝে মাঝে আমরা এটা ঠিক করি না। মানুষ সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির মধ্যে আভিজাত্য এবং সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। সৃষ্টিকর্তার কাছে কিছু দাবি না করে, আমরা জীবন, বুদ্ধি, প্রজ্ঞা, নাক, কান, চোখ, মুখ, জিহ্বা, হাত, পা ইত্যাদি অর্জন করেছি। এই সুন্দর পৃথিবীতে বসবাসের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ, আলো, বাতাস, পানি, খাদ্য ও ফলমূল সবই আল্লাহর রহমতে প্রদত্ত। আমরা গরীব। কিন্তু তিনি একজন ত্রাণকর্তা হন এবং সমস্ত কষ্ট থেকে মুক্তি পান। আপনি যদি তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করেন তবে তিনি কিছুই করতে পারবেন না এবং আপনি চলে যাবেন। আমরা যখন বিপদে পড়ি, তখন আমাদের উচিত আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা। কারণ আমরা যদি এটির প্রশংসা না করি, তাহলে আমরা অহংকার এবং সম্মানের জন্য আমাদের সীমা ছাড়িয়ে গিয়ে নিজেদের ক্ষতি করে ফেলি। কৃতজ্ঞতা এমন একটি গুণ যা কেবল আমাদের সৃষ্টিকর্তার জন্যই সুখ আনে না, বরং আমাদের অন্যদের সম্মান ও ভালবাসাও এনে দেয়। পরিবর্তে, আমরা আরেকটি ভয়ানক শাস্তির সাক্ষী, এবার ঘৃণা ও অপমান।
মহান আল্লাহ সুরা ইব্রাহিমের সাত নম্বর আয়াতে বলিয়াছেন, ‘যখন তোমাদের পালনকর্তা ঘোষণা করিলেন যে, যদি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো, তাহা হইলে তোমাদেরকে আরো দিব এবং যদি অকৃতজ্ঞ হও তাহা হইলে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি হইবে কঠোর’। আবার সুরা লোকমানের ১২ নম্বর আয়াতে বলিয়াছেন, ‘আমি লোকমানকে প্রজ্ঞা দান করিয়াছি এই মর্মে যে, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হও। যে কৃতজ্ঞ হয়, সে তো কেবল নিজ কল্যাণের জন্যই কৃতজ্ঞ হয়। আর যে অকৃতজ্ঞ হয়, (সেক্ষেত্রে জানিয়া রাখা উচিত) আল্লাহ অভাবমুক্ত, প্রশংসিত।’ ইহাতে বুঝা যায়, সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যমেই আমাদের কল্যাণ নিহিত; কিন্তু যদি কৃতজ্ঞতার বদলে আমরা আমাদের চাইতে সমৃদ্ধিশালী অন্য কাহাকে দেখিয়া ঈর্ষাকাতর হই কিংবা সমৃদ্ধি ও ক্ষমতার মদমত্তে অন্যকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করি, ধরাকে সরা জ্ঞান করি বা আমাদের চাইতে যাহারা দুর্বল ও অক্ষম, তাহাদের প্রতি অত্যাচার-নির্যাতনের পথ অবলম্বন করি, তাহা হইলে তাহার পরিণাম কখনো শুভ হয় না, হইতে পারে না।
শুকরিয়া আদায়ের পাশাপাশি আমাদের প্রার্থনা করিতে হইবে। আল্লাহর নবি হজরত সুলাইমান আলাইহিস সালাম পিপীলিকার কথা শুনিয়া আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করিতে যে দোয়াটি করেন তাহা এখানে প্রণিধানযোগ্য। সুরা নামলের ১৯ নম্বর আয়াতে বলা হইয়াছে: ‘হে আমার প্রভু! আমাকে ও আমার পিতামাতাকে যে নিয়ামত তুমি দান করিয়াছ তাহার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিবার শক্তি দান করো। আর আমি যাহাতে তোমার পছন্দনীয় সত্কর্ম করিতে পারি এবং আমাকে তোমার অনুগ্রহে তোমার সত্কর্মপরায়ণ বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত কর।’ তবে শুধু সৃষ্টিকর্তার নিকট নহে, মানুষের নিকট মানুষেরও কৃতজ্ঞতাবোধ থাকা প্রয়োজন। কেননা ইমানকে দুই ভাগ করিলে এক ভাগে থাকে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন, অন্যভাগে ধৈর্যধারণ। একজন বিশ্বাসীর জীবন এই দুইয়ের সমষ্টি। তিনি আপদে-বিপদে ধৈর্য ধারণ করিবেন এবং সুখে ও শান্তিতে শুকরিয়া আদায় করিবেন। ইহার বাহিরে গেলেই ঘটিবে পদস্খলন। তাহার জীবন হইবে হতাশাপূর্ণ। এই কারণে একজন অকৃতজ্ঞ মানুষ সৃষ্টিকর্তার নিকট একেবারেই অপছন্দীয়। একইভাবে মহানবির (স.) বাণী অনুযায়ী মানুষের মধ্যে যাহারা পারস্পরিক কৃতজ্ঞতা আদায় করে না, তাহারা আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতাও আদায় করিতে জানে না। একজন মানুষ যত অধিক কৃতজ্ঞ হইবে, তত অধিক তাহার ভিতর গড়িয়া উঠিবে উন্নত মানবীয় গুণাবলি। এই কারণে অকৃতজ্ঞ ব্যক্তিকে দুনিয়ার মানুষও পছন্দ করে না। তাহারা স্বার্থপর হিসাবে বিবেচিত। এই সকল স্বার্থপর মানুষ হইয়া থাকে জালিম। আর জালিমের পতন অনিবার্য।
