প্রকাশ্য দিবালোকে পটুয়াখালীর বিভিন্ন নদীতে মা-ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান-২০২৩ এর মধ্যে চলছে ইলিশ শিকারের মহোৎসব । পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার পায়রা নদীর উত্তর পাংগাসিয়া, রাজগঞ্জ, আলগী, লেবুখালী, আংগারিয়া, পাতাবুনিয়া ও বাউফলের তেতুলিয়া নদীর নিমদী, ধূলিয়া, চন্দ্রদ্বীপ চলছে ইলিশ শিকারের মহোৎসব। জনবল স্বল্পতা আর যানবাহন সঙ্কটে দায়সারা অভিযান এড়িয়ে উপজেলা প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ, থানা পুলিশ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি সমন্বয়হীনতার সুযোগে জেলেরা পরিবারের ছোট ছোট শিশু-কিশোর সন্তানদের ব্যবহার করে দেদারছে শিকার করছে মা-ইলিশ। দুর্বল ডিজেল ইঞ্জিনের ট্রলারে উপজেলা প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান ফাঁকি দিয়ে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে কৌশলী জেলেরা ইলিশ শিকারের উৎসবে মেতে ওঠেছে।
অবরোধের ৭ থেকে ৮ দিন পরেই পায়রা, পাতাবুনিয়া ও লোহালিয়া নদীর তীরবর্তি জেলেরা বেপরোয়া হয়ে ওঠেছে। নির্বার্হী মেজিস্ট্র্রেটের নেতৃত্বে অভিযান চললেও তাদের ঠেকাতে পারছে না প্রশাসন। প্রশাসন অবশ্য অভিযোগটি মানতে নারাজ। তাদের দাবি অভিযান মোটামুটি সফল হচ্ছে।
নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র জানায়, উপজেলার পাংগাশিয়া, আঙ্গারিয়া, লেবুখালী ও মুরাদিয়া ইউনিয়ন বেষ্টিত পায়রা, পাতাবুনিয়া ও লোহালিয়া নদীর অন্তত ১১টি পয়েন্টে জেলেরা দিনে রাতে সমান তালে ইলিশ শিকার করছে। কম সময়ে বেশি ইলিশ ধরা পরায় প্রজন মৌসুমে নিষেধাজ্ঞার শুরু থেকেই (১২ অক্টোবর) নানান কৌশলের আশ্রয় নিয়ে নদীতে মা-ইলিশ শিকারে নামছে। নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা করছে না কেউ। মৎস্য বিভাগ ও প্রশাসনের বিশেষ অভিযানের গতিবিধি লক্ষ্য রেখেই ওইসব জেলেরা নৌকা-জাল নিয়ে নদীতে ইলিশ শিকার করছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, স্থানীয় কতিপয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আশ্রয়-পশ্রয়ে জেলেরা তাদের পরিবারের ছোট ছোট শিশু-কিশোর সন্তানদের হাতে নৌকা-জাল তুলে দিয়ে ইলিশ শিকার করছে। সূত্রমতে অবরোধকালে প্রতিটি জেলে পল্লীতে উৎসবের আমেজ সৃষ্টি হয়। প্রতিটি জেলে পরিবারের পুরুষ সদস্যরা নৌকা-জাল নিয়ে নদীতে নামে আর নারী, শিশু সবাই নিঘুর্ম পাহাড়ায় রাত কাটায় নদীর তীরে। দূর-দুরান্তে অভিযানের ট্রলারের শব্দ বা উপস্থিতি টের পেলেই মোবাইল ফোনে স্ব স্ব জেলেদের সতর্ক সঙ্কেত জানিয়ে দেয় তারা। সঙ্কেত পাওয়া মাত্রই দ্রুত নৌকা-জাল নিয়ে উপজেলার সীমানা ছাড়িয়ে নদীর অপর তীরে বাকেরগঞ্জের দুধলমৌ, পান্ডব নদীর সাদিস, নলুয়া, মির্জাগঞ্জের কাঠালতলী ও লোহালিয়ার ওপারে বাউফলের বিভিন্ন এলাকার নিরাপদ ঝোপের আড়ালে, পাতাবন ও ছোট ছোট নালা খালে ঢুকে আত্মগোপনে চলে যায়। অভিযানের ট্রলার ফাঁকা নদীতে মহড়া দিয়ে চলে গেলে ফের জাল ফেলে রাতভর ইলিশ শিকারে মেতে ওঠেন তারা। ইলিশ শিকারের মহোৎসব
এ প্রতিবেদক শনিবার বিকেলে পটুয়াখালীর দুমকী উপজেলার উত্তর পাংগাশিয়া এলাকায় নদী জুড়ে জেলেদের ইলিশ মাছ শিকাররত অবস্থায় গিয়ে দেখতে পান। অবস্থানকালীন সময়ে একটি জেলে নৌকার অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেদের ধরা মাছ নিয়ে কিনারে নৌকা ভিড়ানোর পর তার বাবা জালাল মাঝির ব্যাগের মধ্যে থেকে ৫০০ থেকে ৭০০ গ্রামের ১২টি ইলিশ মাছ দেখতে পান এ প্রতিবেদক। জালাল মাঝি তার সহজ সরল স্বীকারোক্তির মাধ্যমে জানান, কিস্তির টাকা পরিশোধসহ পেটের ক্ষিধায় মাছ ধরতে বাধ্য হন। ছোট বেলায় থেকেই তিনি ইলিশ মাছ ধরেন এবং এ মাছ ধরার উপরেই তার সংসার চলে।
তিনি বলেন, নদীর কুলে সবাই এ মাছ ধরেই চলে, নদীর কুলে নৌকার অভাব নাই।এ বছর মাছ কম, প্রতিদিন গড়ে ৪টি মাছ পাই, ৫ থেকে ৬ শ’ টাকা দরে মাছ বিক্রি করি। সরকারি সহায়তার গম চাল পাই, কিন্তু এ বছরে আমার নাম দেয়া হয় নাই।
সূত্রটি আরো জানায়, চলতি মৌসুমে টনকে টন ইলিশ ধরা পরলেও তা বাজারজাত হচ্ছে না। নির্দিষ্ট কয়েকজন পাইকার বিভিন্ন ঘাটে গোপনে মাছগুলো কিনে নিয়ে মজুদ করে রাখছে। অবরোধের পরে তা বাজারে তোলা হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপজেলার হাজিরহাট, লেবুখালী ফেরিঘাট, ভাঙ্গার মাথা, আঙারিয়া বন্দর, পাতাবুনিয়ার হাট, জেলেপাড়া, উত্তর মুরাদিয়া ও জোয়ারগরবদিসহ অন্তত ১১টি ঘাটে পাইকারদের গোপনীয় আস্তানায় ককশিট ভর্তি করে ইলিশ মাছ মজুদ রাখা হচ্ছে।
