আল্লাহ তায়ালা মানবজাতির

আল্লাহ তায়ালা মানবজাতির উদ্দেশে পবিত্র কুরআনুল কারিমে ইরশাদ করেন, ‘হে ঈমানদাররা, তোমরা ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকো, আল্লাহর ওয়াস্তে ন্যায়সঙ্গত সাক্ষ্য দান করো, তাতে তোমাদের নিজের বা পিতা-মাতার অথবা নিকটাবর্তী আত্মীয়স্বজনের যদি ক্ষতি হয় তবুও। কেউ যদি ধনী কিংবা দরিদ্র হয়, তবে আল্লাহ তাদের শুভাকাক্সক্ষী তোমাদের চেয়ে বেশি। অতএব, তোমরা বিচার করতে গিয়ে রিপুর কামনা-বাসনার অনুসরণ করো না। আর যদি তোমরা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা বলো কিংবা পাশ কাটিয়ে যাও, তবে আল্লাহ তোমাদের যাবতীয় কাজকর্ম সম্পর্কেই অবগত।

আলোচ্য আয়াতে সব মুসলমানকে ইনসাফ ও ন্যায়নিষ্ঠার ওপর অটল থাকতে এবং সত্য সাক্ষ্য দান করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সম্ভাব্য প্রতিবন্ধকতাগুলোও স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একই বিষয় প্রসঙ্গে সূরা মায়েদা ও সূরা হাদিদে দু’টি আয়াত রয়েছে। সূরা হাদিদের আয়াত দ্বারা বোঝা যায়, হজরত আদম আ:-কে প্রতিনিধিরূপে দুনিয়ায় পাঠানো, অতঃপর একের পর এক নবী প্রেরণ এবং শতাধিক ছহিফা ও আসমানি কিতাব অবতীর্ণ করার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল দুনিয়ার বুকে শান্তিশৃঙ্খলা এবং ইনসাফ ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা, যাতে প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ নিজ ক্ষমতার গণ্ডির মধ্যে ইনসাফ ও ন্যায়নীতির ওপর অবিচল থাকে। শিক্ষা-দীক্ষা, ওয়াজ-নসিহত, তালিম ও তরবিয়তের মাধ্যমে যেসব অবাধ্য লোককে সত্য ও ন্যায়ের পথে আনা যাবে না, তাদেরকে প্রশাসনিক আইন অনুসারে উপযুক্ত শাস্তি দান করে সৎপথে আসতে বাধ্য করা হবে।

কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের দ্বারা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, ইনসাফ ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠা ও তার ওপর অবিচল থাকা শুধু সরকার ও বিচার বিভাগেরই বিশেষ দায়িত্ব নয়, বরং প্রত্যেককে ব্যক্তিগতভাবেও নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যেন সে নিজে ন্যায়নীতির ওপর স্থির থাকে এবং অন্যকেও ইনসাফ ও ন্যায়নীতির ওপর অবিচল রাখার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করে। অবশ্য ইনসাফ ও ন্যায়নীতির একটি পর্যায় সরকার ও শাসন কর্তৃপক্ষের বিশেষ দায়িত্ব। তা হচ্ছে দুষ্ট ও অবাধ্য লোকেরা যখন ন্যায়নীতিকে পদদলিত করবে নিজেরা তো ন্যায়নীতির ধার ধারবেই না, বরং অন্যকেও ন্যায়নীতির ওপর স্থির থাকতে দেবে না, তখন তাদেরকে দমন করার জন্য আইনের শাসন ও শাস্তির ব্যবস্থা করা অপরিহার্য। এমতাবস্থায় একমাত্র ক্ষমতাসীন সরকার ও কর্তৃপক্ষই ইনসাফ ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।

বর্তমান বিশ্বের মূর্খ জনগণ তো দূরের কথা, শিক্ষিত সুধীরাও মনে করেন যে, ইনসাফ ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠা করা শুধু সরকার ও আদালতেরই দায়িত্ব, এ ব্যাপারে জনগণের কোনো দায়দায়িত্ব নেই। এমন ভ্রান্ত ধারণার কারণেই বিশ্বের সব দেশে সব রাজ্যে সরকার ও জনগণ দু’টি পরস্পরবিরোধী শক্তিতে বিভক্ত হয়ে গেছে। শাসক ও শাসিতের মধ্যে দুস্তর ব্যবধান সৃষ্টি হয়েছে। সব দেশের জনগণ সরকারের কাছে ইনসাফ ও ন্যায়নীতি দাবি করে, কিন্তু নিজেরা কখনো ন্যায়নীতি পালন করতে প্রস্তুত নয়। আল্লাহ তায়ালা মানবজাতির

এরই কুফল আজ সারা বিশ্বকে গ্রাস করেছে। আইনকানুন নিষ্ক্রিয় ও অপরাধপ্রবণতা ক্রমবর্ধমান। আজকাল সব দেশেই আইন প্রণয়নের জন্য সংসদ রয়েছে। নির্বাচিত সদস্যরা আর সেটি কার্যকর করার জন্য সরকারের প্রশাসনযন্ত্র সচল হয়ে ওঠে যার অসংখ্য শাখা প্রশাখা সারা দেশে ছড়িয়ে রয়েছে। প্রত্যেক শাখার দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন দেশের সুদক্ষ বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিরা।

দেশের শান্তিশৃঙ্খলা, কল্যাণ ও নিরাপত্তার জন্য তার সক্রিয় কর্মতৎপরতা প্রদর্শন করছেন; কিন্তু এত বিপুল আয়োজন সত্ত্বেও প্রচলিত তন্ত্রমন্ত্রের মোহমুক্ত হয়ে, তথাকথিত সভ্যতা ও সংস্কৃতির ঠিকাদারদের অন্ধ অনুকরণের ঊর্ধ্বে উঠে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করলে প্রত্যেকেই স্বীকার করতে বাধ্য হবেন যে, ফলাফল অত্যন্ত নৈরাশ্যজনক।

যুদ্ধের কারণে মানবতা কাঠগড়ায়

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments