ক্রিকেটটা সাকিব আল হাসানের ঠোটস্থ। বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডারদের একজনও বটে। কিন্তু রাজনীতির মাঠে তিনি নয়া সৈনিক। তবে নতুন হলেও পথটা চিনতে খুব একটা অসুবিধা হয়নি।
আর যাত্রাতেই হাঁকালেন ছক্কা। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাগুরা-১ আসন থেকে নৌকা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হয়েছেন সাংসদ। রোববার ওই আসনের ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী ১ লাখ ৮৫ হাজার ৩৮৮ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হন সাকিব।
মাগুরা-১ আসনে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে ছিলেন চারজন। তারা হলেন– বাংলাদেশ কংগ্রেসের কাজী রেজাউল হোসেন, জাতীয় পার্টির মো. সিরাজুস সায়েফিন, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্টের (বিএনএফ) কে এম মোতাসিম বিল্লা ও তৃণমূল বিএনপির সনজয় কুমার রায়। কিন্তু সাকিবের ঘূর্ণিতে এই চারজনের কেউ কূলকিনারা পাননি।
একাই চার উইকেট তুলে নেন ক্রিকেটার থেকে রাজনীতিতে আসা এই প্রার্থী! জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, মাগুরা-১ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৪৮৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৮৬২ জন, আর নারী ভোটারের সংখ্যা ১ লাখ ৯৯ হাজার ৬২১। ভোটকেন্দ্র ১৫২টি। যেখানে সাকিবের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ডাব মার্কার কাজী রেজাউল হোসেন পান মাত্র ৫ হাজার ৯৭৩ ভোট। রাজনীতির মাঠে তিনি নয়া
সাকিবের রাজনৈতিক নেতা বনে যাওয়ার কাজটা একেবারে সহজ ছিল না। তাঁর পরিবার থাকে যুক্তরাষ্ট্রে। পারিবারিকভাবে কোনো রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ছিল না সাকিবের। সে জন্য যখন মাগুরা-১ আসনে জাতীয় দলের এই তারকা ক্রিকেটারকে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়, তখন স্থানীয় রাজনীতিবিদদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
অবশ্য ধীরে ধীরে সবকিছু স্বাভাবিকও হয়ে যায়। সাকিবও কোমর বেঁধে জনসংযোগে নামেন। তাতে স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গেও তাঁর সখ্যতা বাড়ে। ছুটে যান ভোটারদের দ্বারে দ্বারে। শোনেন সবার সুখ-দুঃখের গল্প।
তবে পাড়া-মহল্লায় ভোট চাইতে গিয়ে অনেক মধুর যন্ত্রণায়ও পড়তে হয় সাকিবকে। সবকিছু মুখ বুঝে সয়ে নৌকাকে জেতানোর গানই গেয়ে যান দিনরাত।
তাঁর এই যাত্রায় সঙ্গী হয়েছিলেন মুমিনুল হক, নাঈম ইসলাম, সৌম্য সরকার, রনি তালুকদার, রুবেল হোসেনসহ সতীর্থ ক্রিকেটাররা।
এদের অনেকেই সাকিবের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে মাগুরা পর্যন্ত যান। প্রচারণার অংশ হিসেবে প্রীতি ক্রিকেট ম্যাচেও অংশ নিয়েছিলেন সাকিব। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেদিন ফরিদপুরে নির্বাচনী জনসভা করেছিলেন, সেখানেও তাঁকে ভোট চাইতে দেখা যায়।
এখানেই শেষ নয়, শৈশবের কোচ নাজমুল আবেদীন ফাহিম, মোহাম্মদ সালাউদ্দিনরাও সাকিবের আমন্ত্রণে মাগুরায় যান। এর পর সাকিবও দেশের অসংখ্য গণমাধ্যমে একাধিক সাক্ষাৎকার দেন। সেসব সাক্ষাৎকারে উঠে আসে মাগুরা নিয়ে তাঁর আশা-ভরসার কথা। নির্বাচিত হলে মাগুরার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, খেলাধুলায় দারুণ এক পরিবর্তন আনবেন, ফ্রি-ল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে যুবসমাজের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করবেন সেসব আশ্বাসের কথা। এখন এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর সেসব বাস্তবায়নের পালা।
যুগে যুগে এমন অনেকেই ক্রীড়াঙ্গন রাঙিয়ে আবার রাজনীতির ময়দানেও নাম লেখান। কেউ কেউ সেখানে পান সফলতার দেখাও। যার উদাহরণ হতে পারে ইমরান খান, অর্জুনা রানাতুঙ্গা, মনোজ তিওয়ারি, রোমারিও, রাজ্যবর্ধন সিং রাঠোর, জর্জ উইয়াহ, ম্যানি প্যাকিয়াও, সেইকো হাশিমোতো, সেবাস্তিয়ান কো, মার্কাস স্টিফেনরা। সাকিবও এখন তাদের দলে। যেখানে মাশরাফি নাম লেখান তারও আগে।
প্রথমবারের পর এবারও জয়ের হাসি ফুটেছে ম্যাশের মুখে। পাঁচ বছর আগে ২০১৮ সালেও জাতীয় নির্বাচন করেছিলেন মাশরাফি। সেবার নির্বাচিত হওয়ার পর সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। নির্বাচিত এলাকার উন্নয়নে কাজ করেন। সেই আস্থার প্রতিদান আবারও দিয়েছে তাঁর এলাকার ভোটাররা।
এ ছাড়া বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনও নির্বাচিত হয়েছেন। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের সন্তান হলেও এর মধ্যেই সফল ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে সুনাম কুড়িয়েছেন তিনি। কিশোরগঞ্জ-৬ আসনে ২০০৯ সালে উপনির্বাচন দিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। পরের দুই মেয়াদেও একই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এই তিনজনের বাইরেও ক্রীড়াঙ্গনের সঙ্গে সম্পৃক্ত জাহিদ আহসান রাসেল, আবদুস সালাম মুর্শেদী, কাজী নাবিল আহমেদ এবং শফিউল আলম চৌধুরী এবার সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন।
