দেড় দশকে অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত সমৃদ্ধ স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখানো শেখ হাসিনা টানা চতুর্থ মেয়াদে ও মোট পঞ্চমবারের সরকারপ্রধান হওয়ার অনন্য নজির গড়তে চলেছেন।
৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে আওয়ামী লীগ; ভোটের প্রচারে দলের প্রধান শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় রাখার গুরুত্বের কথাই বলে আসছিলেন দলটির নেতারা। এবারের ভোটে ২৯৯টি আসনের মধ্যে ২২৩টিতে জয় পেয়েছে আওয়ামী লীগ। একাদশ সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টিকে পেছনে ফেলে স্বতন্ত্র হয়ে নির্বাচিত হয়েছেন ৬২ জন; যারা সবাই আওয়ামী লীগেরই নেতা। আর জাতীয় পার্টির আসন কমে অর্ধেকের চেয়ে বেশি কমে নেমেছে ১১টিতে। দু’টিতে জয় পেয়েছে আওয়ামী লীগের শরিক দল জাসদ ও বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি এবং একটিতে জয় পেয়েছে কল্যাণ পার্টি। একটি আসনের ভোটগ্রহণ স্থগিত রয়েছে।
এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির শক্ত অবস্থান আরও পোক্ত হলো। শেখ হাসিনার দৃঢ় নেতৃত্বকে ‘হার্ড পাওয়ার’ হিসেবে বর্ণনা করেছে টাইম ম্যাগাজিন, আর বিবিসির ভাষায় সেটা ‘ওয়ান উইমেন শো’।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালে নিহত হওয়ার ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রথম সরকার গঠন করেন তার মেয়ে শেখ হাসিনা।
তবে ২০০১ সালের নির্বাচনে হারতে হয় তাকে, যার পেছনে বিদেশের ষড়যন্ত্র ছিল বলে তিনি নিজেই বিভিন্ন সময় বলে আসছেন। অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার
এরপর ২০০৭ সালে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নতুন ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করতে হয় তাকে; রাজনীতি থেকে তাকে বাদ দেওয়ার সেই চেষ্টার মধ্য দিয়ে দৃশ্যত আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠেন তিনি।
এরপর ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে শেখ হাসিনা যখন দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন, তখন বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ এর কাছাকাছি, ২০১৮ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে সেই প্রবৃদ্ধি ছিল ৮ ছুঁই ছুঁই।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ২০২১ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১০ এর ঘরে নেওয়ার কথা সে সময় বলেছিল আওয়ামী লীগ। কিন্তু ২০২০ সালের মার্চে করোনাভাইরাস মহামারির ধাক্কা লাগে অর্থনীতিতে।
মহামারির খাড়া সামলানোর মধ্যে দুই বছর পর অর্থনীতির ‘বোঝার উপর শাকের আঁটি’ হিসেবে আবির্ভূত হয় রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধ।
২০২২ সালের মাঝামাঝি থেকে জ্বালানি তেল আর আমদানি পণ্যে উচ্চমূল্যের খাড়া সরাসরি এসে লাগে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে; এরপর একের পর এক রেকর্ড হতে থাকে মূল্যস্ফীতিতে।
সরকারি হিসাবে, ২০২৩ সালের মে মাসে মূল্যস্ফীতির পারদ ছুঁয়েছে এক যুগের মধ্যে সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশে। যদিও অনেক অর্থনীতি বিশ্লেষক বলেছেন, প্রকৃত মূল্যস্ফীতি এ হিসাবের চেয়ে বেশি।
রিজার্ভ নিয়ে গর্ব করার মতো অবস্থানে বাংলাদেশ থাকলেও আমদানি ব্যয়ের চাপে ডলার বাজারে দেখা দেয় অস্থিরতা; পরিস্থিতি সামাল দিতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ নেয় সরকার।
চতুর্থবার ক্ষমতায় এসে শুরুতেই লেনদেনে ভারসাম্য এনে ডলার বাজারে স্বাভাবিক করার চ্যালেঞ্জ থাকছে শেখ হাসিনার সামনে। তারল্য সংকটে থাকা ব্যাংকিং খাতেও শৃঙ্খলা ফেরাতে হবে তাকে।
বিদেশে অর্থ পাচার খবরের কাগজে শিরোনাম হচ্ছে বিভিন্ন সময়ে, কিন্তু তার বিপরীতে দৃশ্যমান উদ্যোগ অনুপস্থিত থাকায় দুর্নীতির প্রশ্নটি আসছে জোরেশোরে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, সামগ্রিক দুর্নীতিতে ১৮০ দেশের মধ্যে এখনো দ্বাদশ অবস্থানে বাংলাদেশ।
এবারের নির্বাচনী ইশতেহারেও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণের কথা বলেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। দেশ থেকে অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজের সব স্তরে ঘুষ-দুর্নীতি উচ্ছেদ, অনুপার্জিত আয় রোধ, ঋণ-কর-বিল খেলাপিদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং অবৈধ অর্থ-সম্পদ বাজেয়াপ্তের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
আওয়ামী লীগের টানা তৃতীয় মেয়াদে অবকাঠামো খাতে স্বপ্নের পদ্মা সেতু, ঢাকায় মেট্রোরেল আর নদীর তলদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেলের মতো যুগান্তকারী সব প্রকল্প বাস্তবায়ন হতে দেখেছে বাংলাদেশ।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকে অগ্রগতির মধ্যেও বিদেশিদের কাছ থেকে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গণতান্ত্রিক পরিবেশকে সংকোচনের’ সমালোচনা শুনতে হয়েছে আওয়ামী লীগকে।
