২০২৩ সালটি যে কোনো বিবেচনায় ইউক্রেনের জন্য ভালো ছিল না। যুদ্ধের মধ্য দিয়েই আরো একটি বছর পার করে দেশটি। রাশিয়ার দখল করা ভূমির কিছুই উদ্ধার করতে পারেনি। কিয়েভের নেতৃবৃন্দ পশ্চিমের কাছ থেকে সহায়তার আশা করেও কিছুই পাননি।
ব্ল্যাক সি প্রেইন ইনিশিয়েটিভের মতো কূটনৈতিক উদ্যোগও ভেস্তে গেছে। পশ্চিমারা আশা করেছিল, দুই বছর ধরে চলা যুদ্ধে ইউক্রেন কিছু সাফল্য দেখাক, যা বোঝা যেত তাদের সহায়তা বিফলে যাচ্ছে না।
ইউক্রেন ও তার পশ্চিমা পৃষ্ঠপোষকেরা এখন ধারণা করছে যে এই যুদ্ধে জেতার কোনো আশা নেই। অন্তত গত বছর পর্যন্ত তাদের এমন ধারণা ছিল। সম্ভবত নতুন শুরু হওয়া ২০২৪ সালেও তাদের পূর্বানুমান মোটামুটি একই থাকবে। পরাজিত না হোক, স্পষ্ট জয়ের আশা করা যাচ্ছে না। প্রশ্ন হলো, চলতি বছরটি ইউক্রেনের জন্য কেমন হতে যাচ্ছে? নিরাপত্তা, রাজনীতি ও অর্থনীতি এই তিন ইস্যুতে বিষয়টি পর্যালোচনা করা যাক।
নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যুদ্ধে ভূমির ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার বিষয়টি এখন আর প্রাধান্য পাচ্ছে না। ২০২২ সালের ২২ জুন যুদ্ধ শুরুর পর প্রথম বছর রাশিয়ার দখলে নেওয়া অনেক জায়গাই পুনর্দখল করেছিল ইউক্রেন। দ্বিতীয় বছর তারা বড় সাফল্য পায়নি। সেটি বর্তমানে আলোচনার বিষয়ও নয়। এখন ইউক্রেনের জন্য উদ্বেগের বিষয়, রাশিয়া ফ্রন্টলাইন এমনভাবে সাজাতে শুরু করেছে যে, ইউক্রেনীয় বাহিনী তার সঙ্গে সমানতালে লড়তে সমস্যায় পড়ছে। একই সঙ্গে দোনবাস ও পুরো পূর্ব ইউক্রেনের ওপর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইছেন। সেরকমটা ঘটলে তা যুদ্ধের ফ্রন্টলাইন ইউক্রেনের অনেক ভেতরে চলে যাবে। রাশিয়ার মিসাইল আক্রমণ তখন আরো কাছের থেকে হবে। কিয়েভের ড্রোন হামলা ও ক্রিমিয়ায় ঝটিকা আক্রমণ চালানোর সামর্থ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। ইউক্রেনের জন্য ভালো ছিল
রাশিয়া ও ইউক্রেনের রাজনৈতিক অঙ্গন কেমন থাকে, তা-ও যুদ্ধকে প্রভাবিত করবে নিঃসন্দেহে। মার্চে রাশিয়ায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ধারণা করা হচ্ছে, পুতিনই জিতবেন। অন্যাদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার এবং চলতি বছর অনুষ্ঠেয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন স্থগিত করার অনুমোদন পার্লামেন্টের কাছ থেকে পেয়েছেন। উভয় নেতাই বাহ্যত সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন। তবে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ থেকে তারা মুক্ত নন। গত বছর রাশিয়ায় মিলিশিয়া বাহিনী ওয়াগনার নেতা ইভেগেনি প্রিগোশিন হত্যাকাণ্ডে পুতিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের হাত ছিল বলে জানা গেছে। ইউক্রেন দুর্নীতিবিরোধী নাগরিক গ্রুপগুলো জেলেনস্কির বিরুদ্ধে সরব হচ্ছে।
যুদ্ধের অন্যতম ঘনিষ্ঠ পক্ষ আমেরিকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি একই রকম নয়। রাশিয়া বা ইউক্রেনে যে ক্ষমতার পট পরিবর্তন ঘটছে না, তা মোটামুটি নিশ্চিত। কিন্তু আমেরিকায় জো বাইডেনের দ্বিতীয় মেয়াদে জিতে আসা অনেকটাই অনিশ্চিত। এবার তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
সেটা হলে নির্বাচন যথেষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। ট্রাম্প না হলেও রিপাবলিকান দলের প্রার্থী যিনিই হন, বাইডেনকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। রিপাবলিকান প্রতিপক্ষ ও ভোটারদের সামনে চার বছরের উল্লেখযোগ্য সাফল্য তুলে ধরতে হবে। বিশেষ করে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে সাফল্য কী—গাজায় সংঘাতের পর এই প্রশ্ন আসবেই। ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করতে তাকে ইউক্রেনে কিছু করতে হবে। কিন্তু কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ইউক্রেনের জন্য সহায়তা ছাড় করা যে সম্ভব নয়, সেটা ইতিমধ্যে দেখা গেছে। বাইডেনের পররাষ্ট্রনীতির একটি মাপকাঠি হতে চলেছে ইউক্রেন যুদ্ধ। কারণ এটি ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ নয়, পশ্চিম বনাম রাশিয়ার প্রক্সি যুদ্ধ।
