বাংলাদেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তর মিলিয়ে প্রায় পৌনে তিন কোটি শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষক আছেন মাত্র সোয়া ৯ লাখ। ইউনেস্কো পরিচালক ওদ্রে আজুল (২০২৩) যথার্থই বলেছেন, বৈশ্বিক শিক্ষকস্বল্পতার অন্যতম কারণ শিক্ষকতা পেশায় আসার জন্য যথেষ্ট প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণের অভাব, পেশাগত মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য যথেষ্ট রিসোর্সের অভাব এবং আকর্ষণবিহীন পেশাগত ও শিখন পরিবেশ। উল্লেখ্য, এ বছর ৫ অক্টোবর উদযাপিত বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল– ‘কাঙ্ক্ষিত শিক্ষার জন্য শিক্ষক: শিক্ষকস্বল্পতা পূরণে বৈশ্বিক অপরিহার্যতা’। ইউনেস্কোর মতে, এ বছর বৈশ্বিক শিক্ষকস্বল্পতার সংখ্যা প্রায় ৪৪ মিলিয়ন। বাংলাদেশেও একই পরিস্থিতি বিরাজমান।
শিক্ষকস্বল্পতার জন্য প্রথম যে কারণটি বলা হয়েছে– শিক্ষকতা পেশায় আসার জন্য যথেষ্ট প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণের অভাব– সেটি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পৃথিবীর অনেক দেশই শিক্ষকতা পেশায় মানসম্মত শিক্ষক নিশ্চিত করার জন্য প্রাক-চাকরিকালীন শিক্ষক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করেছে। উন্নত দেশগুলোসহ আমাদের পাশের দেশ ভারতেও এ নিয়ম বিদ্যমান এবং পশ্চিমবঙ্গে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষকতা পেশায় আসার জন্য শিক্ষা একটি বিষয় হিসেবে শিক্ষার্থীরা অধ্যয়ন করেন।
শিক্ষায় ব্যাচেলর ডিগ্রি অর্জনের পরে এ পেশায় আসার জন্য যোগ্যতা অর্জন করেন। পাশাপাশি শিক্ষকদের মান নিশ্চিতে অনেক দেশই শিক্ষক যোগ্যতা মানদণ্ড নির্ধারণ এবং তা ধরে রাখার জন্য শিক্ষকদের নবায়নযোগ্য পেশাগত ছাড়পত্র ব্যবস্থা চালু করেছে। এর ফলে শিক্ষকরা এ পেশায় প্রাক-চাকরিকালীন শিক্ষা অর্জন করেই থেমে থাকছেন না, বরং অবিরাম স্ব-উন্নয়ন প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রায় পৌনে তিন কোটি
শিক্ষকদের পেশাগত মান ধরে রাখার প্রক্রিয়াতেও এসেছে আধুনিকতা। পূর্ণবয়স্ক মানুষের শেখার প্রক্রিয়া বিবেচনা করে পুরোনো সেই মুখোমুখি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মাস্টার ট্রেইনার তৈরি এবং তাদের মাধ্যমে নিম্নমুখী/ক্যাসকেড ধারায় মুখোমুখি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জেলা ও উপজেলাভিত্তিক প্রশিক্ষক তৈরি– এভাবে কয়েক ধাপে শিক্ষকের কাছে পেশাগত প্রশিক্ষণ পৌঁছানোর মডেলকে এখন আর একমাত্র উপায় হিসেবে দেখা হচ্ছে না। কারণ শিক্ষকদের লম্বা সময় মুখোমুখি প্রশিক্ষণ দিলে তাদের মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন এবং এতে তাদের পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনের কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
তা ছাড়া যে আদর্শ পরিবেশে মুখোমুখি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, তার সঙ্গে বিদ্যালয়ের পরিবেশ একরকম না হওয়ায় তারা অর্জিত দক্ষতা শ্রেণিতে সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারেন না। এ জন্য এখন শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিদ্যালয়ে থাকা অবস্থায় মেন্টরিং সাপোর্ট, অনলাইন টিউটোরিয়াল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে এলাকাভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সংযুক্ত করে পেশাগত উন্নয়ন দল গঠনের মাধ্যমে একে অন্যের কাছ থেকে শেখার সুযোগকে অধিক কার্যকর হিসেবে দেখা হচ্ছে। কভিড-১৯-এর অভিজ্ঞতা শিক্ষকদের এই মিশ্র পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ গ্রহণে অনেকটাই প্রস্তুত করেছে।
