দেশের রাজনীতিতে এখন নির্বাচনী আবহ। আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে মানুষের উৎসাহের অন্ত নেই । নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ৪৪টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে ২৯টি।
ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে নির্বাচনী প্রচার। এদিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাধা দিতে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে বিএনপি-জামায়াত। এবারও সেই ২০১৩ ও ২০১৪ সালের মতোই টানা হরতাল, অবরোধ, ভাঙচুর, পুলিশ ও গণমাধ্যমকর্মীর ওপর হামলা এবং চলন্ত বাস-ট্রেনে অগ্নিসংযোগের দিকে ঝুঁকছে তারা।
২০১৩ সালে বিএনপি-জামায়াত প্রায় ৪১৯ টি পৃথক ঘটনায় ১৫ জন পুলিশ সদস্যসহ হত্যা করে ৪৯২ জন নিরপরাধ মানুষকে। এ সব অগ্নিসংযোগ, সংঘর্ষ ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে আহত হয় প্রায় আড়াই হাজার মানুষ। এরপর ২০১৪ সালের নির্বাচনকালীন সময়ে বিএনপি-জামায়াত দেখায় তাদের ভয়ংকরতম রূপ। আগুন দেওয়া হয় সারাদেশের প্রায় ৫৮২টি ভোটকেন্দ্রে, শত শত যানবাহনে, রাস্তার পার্শ্ববর্তী বৃক্ষরাজিতে, এমনকি বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়েও। নির্বাচনে নিশ্চিত পরাজয় জেনে পেট্রোল বোমায় পুড়িয়ে মারে বহু নিরপরাধ সাধারণ জনগণকে। মানুষের আহাজারিতে প্রকম্পিত হয়েছিল সারাদেশের হাসপাতালগুলো। প্রিসাইডিং অফিসারসহ হত্যা করা হয় ২৬ জন মানুষকে। মানুষের উৎসাহের অন্ত নেই
এক বছর পর ২০১৫ সালের আবারও মাথা-চাড়া দিয়ে উঠেছিল আগুন সন্ত্রাস। সে সময় ২ হাজার ৯০৩টি বাস-ট্রাক, ১৮টি ট্রেন, ৮টি যাত্রীবাহী লঞ্চ, ৭টি ভূমি অফিসসহ ৭০টি সরকারি অফিসে পেট্রোল বোমা ছুড়ে বিএনপি-জামায়াত। এসব ঘটনায় প্রাণ হারান ২৩১ জন। গুরুতর আহত হন ১ হাজার ২০০ জন। সেই অগ্নিসন্ত্রাসের বিভীষিকার কথা ভোলেনি দেশের জনগণ।
সেই সময়ে টেলিভিশনে দেখা একটি দৃশ্য আজও চোখে ভেসে উঠে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গিয়েছিলেন বার্ন ইউনিটে অগ্নিসন্ত্রাসের শিকার চিকিৎসাধীনদের দেখতে। তার হাত ধরে কাঁদছিলেন এক নারী, নাম গীতা সরকার। কাঁদতে কাঁদতে গীতা যে কথাগুলো বলছিলেন, সেগুলো মনে গেঁথে আছে।
তিনি বলছিলেন, ‘ওরা যে বোমাগুলো মারে বা যারাই মারে, ওদের শনাক্ত করুন এবং যারা অর্ডার দেয়, তাদের পরিবারের লোককে ধরে ধরে আপনারা আগুনে পুড়িয়ে দেন। ওরা অর্ডার দিতে পারে, আমাদের তো রক্ষা করতে পারে না। আমাদের জন্য আপনারা সরকার। আমরা আপনাদের তৈরি করছি, আমাদের রক্ষা করেন’। গীতা সরকারের সেদিনের সেই আকুতি কি দেশের ১৭ কোটি মানুষের আকুতি ছিল না?
আজ পর্যন্ত সেই অগ্নিসন্ত্রাসের কার্যক্রম চলছে। গত ১৩ ডিসেম্বর বিএনপি-জামায়াতের ডাকা অবরোধ উপেক্ষা করে নিজের গন্তব্যে যেতে ট্রেনে উঠেছিলেন সাধারণ যাত্রীরা। কিন্তু পথে অবরোধকারীরা গাজীপুরের ভাওয়ালে রেললাইন কেটে ফেলায় মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেসের সাতটি বগিসহ উল্টে পড়েছিল।
এতে একজন নিহত ও কয়েক ডজন মানুষ আহত হন। ১৯ ডিসেম্বর নেত্রকোনা থেকে ঢাকাগামী মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেসে ট্রেনে আগুন দেওয়া হলে মা ও শিশু সন্তানসহ অন্তত চারজনের মৃত্যু হয়। এর আগে ১৪ ডিসেম্বর নীলফামারীর ডোমারে রেললাইনের ৭২টি ক্লিপ খুলে ফেলে নাশকতার চেষ্টা করা হয়েছিল। প্রতিদিনই হরতাল-অবরোধের নামে চলছে বাস-ট্রেনে আগুন ও ভাঙচুরের ঘটনা। বিগত ২৮ অক্টোবর থেকে আজ পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোট ৬৫০টিরও বেশি গণপরিবহনে অগিসংযোগের মাধ্যমে পুলিশ ও ঘুমন্ত শ্রমিককে হত্যা করেছে। আন্দোলনের নামে এসব কি ঘটছে এই স্বাধীন দেশে?
বিগত ২০১৩-১৪ সালে আন্দোলনের পর ব্যবসায়ী সংগঠনের করা এক জরিপে বলা হয়েছিল, একদিনের হরতাল-অবরোধে অর্থনীতির ক্ষতি হয়েছে গড়ে ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু পোশাক খাতে ক্ষতি ৩৬০ কোটি টাকা। সরকারি রাজস্ব খাতে ১ দিনের ক্ষতি ২৫০ কোটি টাকা।
শিক্ষা খাতে ক্ষতি ৫০ কোটি টাকা। পাইকারি মার্কেট, শপিংমল ও অন্যান্য শপে ১ দিনের হরতাল-অবরোধে ক্ষতি ৬০০ কোটি টাকা। আর্থিক ও ভ্রমণ খাতে ক্ষতি ৫০ কোটি টাকা। যাতায়াত খাতে ক্ষতি ৬০ কোটি টাকা। উৎপাদন খাতে ১০০ কোটি ও আর অন্যান্য খাতে ১ দিনের ক্ষতি ৬৫ কোটি টাকা। বর্তমানে অর্থনীতির আকার ৪ গুণ বেড়েছে। ফলে এ সময়ের হরতাল-অবরোধ কর্মসূচিতে ক্ষতিও সেই হারেই বাড়ছে।
